হাঁটিহাঁটি পা পা করে এগিয়ে যাচ্ছে দেশের ওষুধ শিল্প। এর পেছনে রয়েছে পেশাদারিত্ব আর অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার। পোশাক শিল্পের পর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম সম্ভবনাময় খাত ওষুধ শিল্প। এ শিল্পকে আরো এগিয়ে নিয়ে যেতে প্রয়োজন সরকারের সার্বিক পৃষ্ঠপোষকতা। পাশাপাশি এ খাতে পেশাদার জ্ঞানের অধিকারী তরুণ উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসতে হবে। সফল হতে ধৈর্য্য ধরতে হবে। বজায় রাখতে হবে ব্যবসায়ীক সততা ও নিষ্ঠা। বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের এমন নানাদিক নিয়ে কথা বলেছেন নোভেল্টা বেস্টওয়ে ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মল্লিক মাহমুদ হোসেন। পেশাদার ও সফল এ উদ্যোক্তার সঙ্গে কথা বলেছেন ঢাকা টাইমসের প্রতিবেদক হাবিবুল্লাহ ফাহাদ।

বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? এমন প্রশ্নের জবাবে জ্ঞান এবং প্রযুক্তিগত দিক বিচারে ওষুধ শিল্পকে অতুলনীয় খাত হিসেবে মন্তব্য করেন মল্লিক মাহমুদ হোসেন। বললেন, দেশে ওষুধের এক দশমিক ১৩৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাজার রয়েছে। ২০১১ সালে এ শিল্প ২৩ দশমিক ৫০ ভাগ প্রবৃদ্ধি অর্জন করে। গত কয়েক বছর ধরে এ খাতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জিত হচ্ছে। আশা করা হচ্ছে, আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের বাজার বছরে ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে।

বৈদেশিক মুদ্রার অর্জনে ওষুধ শিল্প বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম দ্বিতীয় সম্ভাবনাময় খাত উল্লেখ করে তিনি বলেন, ওষুধ রপ্তানি দেশের প্রবৃদ্ধিতে সরাসরি অবদান রাখছে। প্রতি বছর এর পরিমাণ বাড়ছে। বাংলাদেশ বিশ্বের ৮৬টি দেশে ওষুধ রপ্তানি করছে। এর মধ্যে এশিয়া অঞ্চলের দেশ মায়ানমার, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া। ইউরোপের অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, স্পেন। আফ্রিকার কেনিয়া, ঘানা, সোমালিয়া। লাতিন আমেরিকার ভেনেজুয়েলা, মেক্সিকো, হুন্ডুরাস, কলোম্বিয়া ও ব্রাজিল উল্লেখযোগ্য। ওষুধ শিল্পের আরও প্রসারের জন্য সরকারের উচিত হবে এ খাতকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়ে উৎসাহিত করা। এখনই এর উপযুক্ত সময়।

শুধু উদ্যোক্তা নয়; পেশাদারিত্ব আছে এমন তরুণদের এ খাতে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে নোভেলটা বেস্টওয়ে ফার্মাসিউটিক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, তরুণদের মধ্যে যে পেশাদারিত্ব আছে তা অন্যদের মধ্যে পাওয়া যাবে না। তরুণ যারাই সফল হয়েছেন সবাই তাদের পেশাদারিত্ব দিয়েই এগিয়েছে। তিনি বলেন, প্রতিবছর ৯৯.০৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করেছে পোশাক শিল্প। ওষুধ শিল্পের বৈদেশিক মুদ্রার আয় প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার। তাই বলে পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তা ও ওষুধ শিল্পের উদ্যোক্তাদের এক ভাবার সুযোগ নেই। অনেক পোশাক শিল্পের মালিক চেষ্টা করেছিলেন ওষুধ শিল্পে কিছু করার জন্য। কিন্তু তারা ওই অর্থে সফল হতে পারেননি। কারণ ওষুধ শিল্প নির্ভর করে উচ্চ জ্ঞান ও প্রযুক্তির ওপর। এটিকে বলা হয় হোয়াইট কালার বিজনেস।

উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে সফল দেখতে প্রত্যয়ী মাহমুদ হোসেন বলেন, ‘আমি একজন ফার্মাসিস্ট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রেজুয়েশন সম্পন্ন করেছি। আমি নিজেকে একজন উদ্যোক্তা হিসেবে দেখতে চেষ্টা করেছি। একটি ওষুধ শিল্প গড়ে তুলতে ফার্মাসিস্টের পাশাপাশি কেমিস্ট, বায়োকেমিস্ট, ফিজিশিয়ান, মার্কেটিং সবকিছুর সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রয়োজন। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমি সফলতার পথে এগোচ্ছি বলে মনে করি। তবে একজন ফার্মাসিস্ট এ শিল্পে মূল ভূমিকা পালন করে। দেশের ফার্মাসিস্টরা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। যার ফলস্রুতিতে দেশে ওষুধ শিল্প দিন দিন এগিয়ে যাচ্ছে।

তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, উচ্চবৃত্ত পরিবারের সন্তানদের পেশা নির্বাচনে অনেকসময় পারিবারিক প্রভাব থাকে। বাবা রাজনীতি করেছেন। সংসদ সদস্য হয়েছেন। আমিও রাজনীতি করব। নেতৃত্ব দেব। এ অবস্থা সবখানে। বাবা শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন আমি সেখানকার পরিচালক হবো। তারপর একসময় ব্যবস্থাপনা পরিচালক হবো। এ ধরনের প্রবণতা বেশি। কিন্তু আমরা যারা উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত, পেশাদারিত্বকে নিজের মধ্যে ধারণ করি; তারা মনে করি আমাকে আমার নিজের জায়গা নিজেকেই করে নিতে হবে। নতুন কিছু করতে হবে। তাই সফল উদ্যোক্তা না বলে বলতে হবে, পেশাদার ও সফল উদ্যোক্তা।

ওষুধ উৎপাদনের বিভিন্ন প্রেক্ষাপট তুলে ধরে মল্লিক মাহমুদ হোসেন বলেন, বর্তমানে দেশে ২৬০টি নিবন্ধিত ওষুধ শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে ১৯৫টি প্রতিষ্ঠান ওষুধ উৎপাদন করছে। উৎপাদনকারী এসব প্রতিষ্ঠান ৯৭ শতাংশ দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে। বিশেষ কিছু ওষুধ, ক্যান্সার প্রতিরোধক, হ্যামাটোলজিক্যাল এবং বায়োটেক পণ্য আমদানির প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের বাজার মূলত দেশীয় প্রতিষ্ঠানের দখলে। অর্থাৎ, ৯০ শতাংশ প্রতিষ্ঠানই দেশীয় মালিকানাধীন। এর মধ্যে ৮২ শতাংশ শেয়ার রয়েছে শীর্ষ ২০ প্রতিষ্ঠানের দখলে।

একই জোনের মধ্যে সবগুলো ওষুধ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো নিয়ে আসতে পারলে অভ্যন্তরীণ সহযোগিতা বাড়ত উল্লেখ করে মল্লিক মাহমুদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশে ওষুধ শিল্পের জন্য আলাদা করে শিল্প পার্ক করে দেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। এ ব্যাপারে জমি অধিগ্রহণ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে আমি জানি। তবে এটি যতদ্রুত বাস্তবায়ন হবে ততই ভাল।

তিনি জানান, ওষুধের কার্যকারিতা পরীক্ষার জন্য বায়োইকোভ্যালেন্ট ল্যাব প্রয়োজন। বিদেশে ওষুধ রপ্তানির জন্য এ পরীক্ষা বাধ্যতামূলক। বর্তমানে বিদেশ থেকে এ পরীক্ষা করিয়ে সেই প্রতিবেদনসহ ওষুধ রপ্তানি করতে হয়। তবে আশার কথা হচ্ছে, শিগগির বাংলাদেশে বায়োইকোভ্যালেন্ট ল্যাব স্থাপন হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) ভেতরে এ ল্যাব স্থাপন করা হবে। পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের আওতায় এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। এ ল্যাব স্থাপন করা হলে বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানি সহজ হবে। আগের তুলনায় রপ্তানি বাড়বে বলেও আশা করেন মাহমুদ হোসেন ।